গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করবেন যেভাবে

গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করবেন যেভাবে


Posted on: 2021-07-14 22:47:14 | Posted by: Shafiullah
গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করবেন যেভাবে

বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা হল গরুর খামারের ব্যবসা। সাধারনত ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া, এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপর নির্ভর করে বিভিন্নভাবে পশুপালন করা যায়। আমদের দেশ পশুপালনে অনেকটা পিছিয়ে আছে। এর মূল কারন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পুঁজির অভাব। বর্তমানে আমাদের দেশে যে পরিমান গরুর চাহিদা তার বেশিরভাগই গ্রামে কৃষকদের পালন করা গরু দিয়েই পূরন করা হয়। দুধ এবং মাংসের চাহিদা পুরনের জন্য গরুর চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত যোগান নেই। এরজন্য আমাদেরকে আমদানি নির্ভর হতে হয়। কিন্তু যে হারে দেশে গরুর খামারের সংখ্যা বেড়ে চলছে তা চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে তরুন উদ্যোক্তাগন গরুর খামারের দিকে বেশি ঝুঁকছে। একটা পরিসংখান অনুযায়ী দেশে যেসব গরুর খামার গড়ে উঠছে তার উদ্যোক্তাগনের মধ্যে ৭০% তরুন উদ্যোক্তা।

আজ আমরা গরুর খামার কিভাবে দিবেন, কি ধরনের গরুর খামার দিবেন, গরুর কয়েকটি জাত এবং এদের বৈশিষ্ট, কত টাকা পুজি লাগবে, গরুর খামারের গরু দিয়ে আর কি কি ব্যবসা করা যায় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আপনার যদি গরুর খামারের ব্যবসা করার ইচ্ছা থাকে পুরো আর্টিকেল টি মনোযোগ সহকারে পড়ার অনুরোধ রইল।

 

কেন গরুর খামার দিবেন?

গরুর খামার দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারন হল এটি একটি লাভজনক ব্যবসা তবে যদি আপনি ঠিকমত করতে পারেন। গরুর খামার দিয়ে দুধ, মাংস, বায়োগ্যাস, গোবর, এবং গরু নিয়ে ব্যবসা করা যায়। অর্থাৎ গরুর খামার নিয়ে নানা রকম ব্যবসা করা যায়। যদি আপনি একমাত্র ব্যবসা বা পেশা হিসেবে গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করেন তবে সেটা অনেক বেশি ঝুঁকিপুর্ন হবে। গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করে লোকসান করে রাস্তায় বসেছেন এমন ব্যবসায়ীদের সংখাও কম না। তাই গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করবেন, ভেবে চিন্তে করবেন। তবে কিভাবে লোকসান হয়, লোকসান এড়ানো যায় কিভাবে সেটাও আমরা আলোচনা করব।

 

কিভাবে গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করবেন?

গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করার আগে পরিকল্পনা সাজিয়ে নিবেন। তবে এই পরিকল্পনা সাজানোর জন্য আপনাকে বেশ কয়েকটি খামার পরিদর্শন করতে হবে। ছোট খামার বড় খামার পরিদর্শন করবেন। খামারিদের সাথে কথা বলবেন। তাদের অভিজ্ঞতা জেনে নিবেন। একজন দুজন নয় ন্যুনতম ১০জন খামারির সাথে কথা বলে ধারনা নিবেন। তবে যে যাই পরামর্শ দেয় না কেনো, প্রথমে বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে যাবেন না।

পরিকল্পনার শুরুতে ঠিক করে নিবেন কি ধরনের গরু দিয়ে খামার শুরু করবেন? দুধ উৎপাদনের গরু নাকি মাংস উৎপাদনের গরু দিয়ে। কিছু জাতের গরু আছে যেগুলো খুব দ্রুত বাড়ে কিন্তু বেশি পরিমান দুধ দেয়না। আপনি যদি দুধ উৎপাদনের গরু দিয়ে অর্থাৎ ডেইরি ফার্ম দিতে চান তাহলে যেসব গরু দিয়ে খামার শুরু করতে পারেন সেগুলো হল…

·        হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান। এজাতের গাভী প্রতিদিন ৩০ লিটারের উপরে দুধ দিতে পারে। গায়ের রঙ সাদা কালো মিশানো। লেজের গোড়ার চুল সাদা রঙের হয়। এসব গাভীর ওজন ৪০০-৬০০ কেজি হয়ে থাকে। আর বাছুর জন্মের সময় ৩০ থেকে ৪৫ কেজি ওজন নিয়ে জন্মায়। ৩০ লিটার দুধ পেতে দিনে ৩ বার দুধ দোয়াতে হয়।

·        ব্রাউন সুইচ। এ জাতের গাভী দৈনিক প্রায় ২৫ লিটার দুধ দেয়। এদের গায়ের রঙ সাধারনত কালো হয়। কালো ছাড়াও কিছু গরু লালচে কালো রঙের হয়। এই জাতের গাভীর ওজন ৬০০ কেজি থেকে ৭০০ কেজি হয়ে থাকে। আর ষাঁড়ের ওজন ৬০০ কেজি থেকে ১০৫০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

·        জার্সি। এ জাতের গাভী দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার দুধ দিয়ে থাকে। এর জন্য দিনে তিনবার দুধ দোয়াতে হয়। এ জাতের গাভীর ওজন ৪০০ কেজি থেকে ৫০০ কেজি এবং ষাঁড়ের ওজন ৮০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

·        লাল সিন্ধি। দুধ উৎপাদনের জন্য এই জাতের গরুর কদর অনেক বেশি। এ জাতের গরুর উৎপত্তিস্থল পাকিস্থানের সিন্ধুদের পশ্চিম পাড়ে। গায়ের রঙ লাল এবং উৎপত্তিস্থল থেকেই এই গরুর নামকরন করা হয়েছে লাল সিন্ধি। এ জাতের গরু দিনে গড়ে ১০ লিটার দুধ দেয়। আর আরও বড় বৈশিষ্ট হল এরা বছরে ৩৫০ দিন পর্যন্ত দুধ দিতে পারে।

·        আয়ারশায়ার। এ জাতের গরু দিনে ১৬ থেকে ১৭ লিটার দুধ দেয়। এ জাতের গরুর রঙ সাধারনত লালের উপর সাদা ছোপ ও সাদার উপর লালের ছোপ। গাভীর ওজন ৪৫০ কেজি থেকে ৬০০ কেজি এবং ষাঁড়ের ওজন ৬৫০ কেজি থেকে ১০০০ কেজি হয়ে থাকে।

·        শাহলিওয়াল। এ জাতের গরু দিনে গড়ে ১৫ লিটার দুধ দেয়। এ জাতের গাভির ওজন ৩৫০ কেজি থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত হয় এবং ষাঁড়ের ওজন ৮০০ কেজি থেকে ৯০০ কেজি হয়ে থাকে। এ গরুর রঙ লাল রঙের হয়।

উপরে উল্লেখিত জাতের গরুগুলো সাধারনত দুধ উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়। শুধু দুধ উৎপাদনের জন্যই নয় মাংস উৎপাদনের জন্যও এসব গরু পালন করা হয়। খামারে উৎপাদিত দুধ বিক্রির কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে। সরাসরি গ্রাহকের বাসায় গিয়ে দুধ দিয়ে আসা যায়। দোকানে বিক্রি করা যায়। আবার বাসায় বাসায় গিয়ে দুধ দিয়ে আসে এমন অনেক ব্যবসায়ী আছে তাদের কাছেও দুধ বিক্রি করতে পারবেন। আবার কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে দুধ সাপ্লাই দিতে পারেন। আবার এসব দুধ নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে প্যাকেটিং করে বিক্রি করতে পারবেন। দুধ থেকে ঘি, মাখন, পনির উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারেন।

এবার মাংস উৎপাদনের জন্য কয়েকটি গরুর তালিকা তুলে ধরছি…

·        অ্যাঙ্গাস। এ জাতের গরুর উৎপত্তিস্থল স্কটল্যান্ড, অ্যাবারডিন, কিংকারডিন এর উত্তর-পুর্বাঞ্চলে। এই জাতের ষাড়ের ওজন ৭০০ কেজি থেকে ৮৫০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর গাভীর ওজন ৪৫০ কেজি থেকে ৫৫০ কেজি হয়ে থাকে।

·        আয়ারশায়ার। এই গরুর সংক্ষিপ্ত বর্ননা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

·        ব্রাউন সুইচ। এই জাতের গরুর সম্পর্কেও উপরে আলোচনা করা হয়েছে।

·        লাল সিন্ধি। এর সম্পর্কেও আগে আলোচনা করা হয়েছে।

·        শাহিওয়াল। এর সম্পর্কেও আগে আলোচনা করা হয়েছে। মাংস উৎপাদনের জন্য শাহিওয়াল জাতের গরু বাংলাদেশের খামার ব্যবসায়ীদের কাছে অধিক পছন্দনীয়। মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে গরু পালন করলে আমরা এই শাহিওয়াল গরু পালন করার পরামর্শ দিব।

·        হরিয়ানা। এ জাতের গরুর উৎপত্তিস্থল ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোটাস, কার্নাল হিসার এবং গুরুগাঁও জিলা। এই জাতের গরু শারিরিক ভাবে অনেক শক্তিশালী, আকারে লম্বা এবং উচু। এদের গায়ের রঙ সাদা বা হালকা ধুসর বর্নের। এ জাতের একটি ষাড়ের ওজন ৫০০ কেজি থেকে ৭০০ কেজি হয়ে থাকে। এবং গাভীর ওজন ৪০০ কেজি থেকে ৫৫০ কেজি হয়ে থাকে। এরা দিনে ৫ লিটার দুধ দেয়।

উপরে উল্লেখিত গরুগুলো সাধারনত মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়ে থাকে। এসব গরু নিয়ে পড়াশুনা করে নিবেন। কোন গরু নিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন এবং সে গরু কিভাবে পালন করবেন তা ভালো করে জেনে নিবেন। আপনার পুঁজি দিয়ে সে গরু কিনে ভরনপোষন করতে পারবেন কিনা তা আগেই দেখে নিবেন। আমাদের পরামর্শ থাকবে প্রথমে দুধের গরু দিয়ে ব্যবসা শুরু করা উচিত। কারন মাংস উৎপাদনের গরু দিয়ে আপনার ব্যবসা শুরু করলে লাভের মুখ দেখতে অনেক দিন পর্যন্ত সময় লাগবে। আর এর জন্য আপনাকে অনেক বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। তাই আপনাকে প্রথমে গরুর দুধের ব্যবসা করতে হবে। এসব গাভী থেকে বাছুর জন্ম নিবে। সেগুলো কিছু থাকবে ষাড়। এগুলোই আপনি বড় করে বিক্রি করতে পারবেন। নতুন করে আপনাকে ষাড় কিনতে হবেনা।

এভাবে পরিকল্পনা ঠিক করার পর স্থান নির্বাচন করবেন। এমন স্থান নির্বাচন করবেন যেটা শহর থেকে বেশি দূরে নয় এবং কম ব্যায়বহুল। একটা প্লেস নির্বাচন করে সেটা প্রথমে তিন বছরের জন্য লিজ নিয়ে নিবেন। তিন বছরের জন্য লিজ নেওয়া স্থানে অস্থায়ীভাবে গরুর জন্য ঘর বানাবেন। গরু দেখাশোনা করার জন্য লোক ঠিক করে তারপর গরু কিনবেন। গরু কিনলে কোনো খামার থেকে গরু কিনার চেষ্টা করবেন। বাজার থেকে গরু কিনার চেয়ে খামার থেকে গরু কিনাই ভালো হবে। আর খামার থেকে গরু কিনলে ঐ গরুর দিকে কয়েকদিন নজর রাখবেন। তারপর অভিজ্ঞ কারও মাধ্যমে গরু কিনবেন।

এভাবে আপনি গরুর ব্যবসা শুরু করবেন।

 

গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা পুঁজি লাগবে?

গরুর খামারের ব্যবসা শুরু করতে ঠিক কত টাকা পুঁজি লাগবে তা নির্ভর করবে আপনি কি পরিসরে ব্যবসা শুরু করতে চান তার উপর। একটি মোটামুটি মানের শাহিওয়াল জাতের ষাড় ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আবার একটি ভালো মানের হলস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের গরুর দাম আড়াই লাখ টাকা থেকে ৬ লাখ টাকা হয়ে থাকে। গরুর দাম এবং অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে আপনি এই ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।

তবে আপনি চাইলে আরও কম টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। আগেই বলেছি পুঁজির বিষয়টা আপনার পরিকল্পনার উপর নির্ভর করবে।


গরুর খামারের গরু দিয়ে আর কি কি ব্যবসা করা যায়?

আপনি চাইলে গরুর খামারের গরু এবং দুধ ছাড়াও আরও ব্যবসা করতে পারবেন। এই যেমন ধরুন ঘি, মাখন, পনির এগুলো তৈরি করে বিক্রি করতে পারবেন। এইসব পন্যের কাস্টমার প্রথমে আপনি পাবেন না। ধীরে ধীরে কাস্টমার পাবেন। এগুলো ছাড়াও গরুর গোবর বিক্রি করতে পারবেন। অনেকে গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করে বিক্রি করে। আপনিও এগুলো বিক্রি করতে পারেন। গরু থেকে যে বাছুর জন্ম হবে সেগুলোও বিক্রি করে দিতে পারেন। তবে পরামর্শ থাকবে বাছুর বিক্রি না করে সেগুলো বড় করে বিক্রি করবেন। এতে দাম বেশি পাবেন।

গরু বিক্রি করবেন কিভাবে?

বাংলাদেশের জন্য গরু বিক্রির সবচেয়ে ভাল সময় হল কুরবানির ঈদ। এ ঈদকে কেন্দ্র করে যে হাট বসে সেখানে আপনি গরু সাপ্লাই দিতে পারেন। সেখানে ভালো বেচাকিনি হয়। আর আরও ভালো উপায় হল সরাসরি খামার থেকে গরু বিক্রি করা। এখন অনেকেই গরুর হাট থেকে গরু না কিনে সরাসরি খামার থেকে গরু কিনে। তবে সরাসরি খামারে কাস্টমার পেতে ভালো ভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। আপনার এলাকায় বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে আপনার খামারের বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে আপনার এলাকার আশেপাশের অঞ্চলের জন্য পোস্ট বুস্ট করবেন। ইউটিউবেও গরু নিয়ে ভিডিও আপলোড দিবেন। এর ফলে কাস্টমার পাবেন।

গরুর খামার ব্যবসায় লোকসান হয় কিভাবে?

এই ব্যবসায় লোকসান হওয়ার সবচেয়ে বড় কারন গরুর রোগব্যাধি। কখনও এমন দেখা যায় গরুর সংক্রমন রোগ হয়ে খামারের সব গরু মারা যায়। এসব এড়াতে গরুর সব টিকা দিয়ে রাখবেন। গরুর স্বাস্থের দিকে বেশি নজর রাখবেন। নিয়মিত গরু চিকিৎসক দিয়ে চেক আপ করিয়ে নিবেন। আর বাহিরের কোনো মানুষ যেনো খামারে যততত্র প্রবেশ না করতে পারে। খামারের অন্যান্য কর্মচারি খামারে প্রবেশ করে ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে নিবে। 


আজকের আলোচনা নিয়ে কোনো মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করবেন।

ধন্যবাদ।


জনপ্রিয় পণ্য

সাম্প্রতিক পণ্য

Leave a Comment:

Comment as:

alibaba & Import Export expert

সি এন্ড এফ, আমদানি, আলিবাবা নিয়ে যেকোনো সমস্যায় আমাকে ফেসবুকে মেসেজ করুন

এখানে ক্লিক করুন
2017 © 2021 eibbuy. All Rights Reserved.
Developed By Takwasoft